বাঙালিদের কাছে উৎসবের চির প্রাসঙ্গিকতা ও সর্বজনীনতা
পাভেল আমান
জীবন নিরবধি। ক্ষণজন্মা জীবনের প্রতিটি মুহূর্তকেই মানুষ নিজের মত করে আঁকড়ে ধরে আপন করে নিতে চাই যেখানে তার সমস্ত কিছু ভালোলাগা, অনুভূতি, চিন্তন একীভূত হয়ে যায়। জন্ম থেকে মৃত্যু পর্যন্ত মানুষের জীবনের দীর্ঘ চলার পথে নানা দুঃখ বেদনা, প্রাপ্তি ও প্রত্যাশা, হতাশা উচ্চাকাঙ্ক্ষা, ঘাত প্রতিঘাত, বেদনা ক্ষোভ বিক্ষোভ জ্বালা যন্ত্রণা প্রভৃতি জড়িয়ে আছে। জীবনের শ্রেষ্ঠ জীব মানুষ। বিদ্যা, বুদ্ধি, বিচক্ষণতা, প্রাজ্ঞতা চিন্তা ভাবনায় মানুষ প্রাণীকুলের সর্বশেষ্ঠ আসন অলংকৃত করে বসে আছে। তবুও মানুষের বেঁচে থাকাটা সব সময় প্রতিবন্ধকতার ধারাবাহিক বিচ্ছিন্নতায় কুসুমাস্তীর্ণ হয়ে ওঠেনি। মানুষ চলার পথে বেঁচে থাকার রসদ হিসেবেই প্রতিনিয়ত খুঁজে বেড়িয়েছে মানসিক শান্তি, নিরাপত্তা, আনন্দ, ভালোবাসা। পার্থিব মোহ সম্পদের আকাঙ্ক্ষা, বিত্ত বৈভব, বিলাসিতা সর্বদা মানুষকে উত্তরণের পথ দেখাতে পারেনি। মাঝে মাঝে দিকভ্রষ্ট করেছে। নেমে এসেছে অবসাদ দুর্যোগের ঘনঘটা। মানব সভ্যতার সূচনা লগ্ন থেকেই মানুষ সৌন্দর্যের পূজারী এবং মানসিক শান্তি পরিস্থিতির জন্য খুজে পেয়েছি জীবনের ভালো লাগার, অনুভূতি শাশ্বত মরুদ্দ্যান। সেই চিরায়ত ভালোলাগাকে তারিয়ে তারিয়ে প্রাণভরে উপভোগ করতে সমাজে সৃষ্টি হয়েছে উৎসব-পার্বণ অনুষ্ঠান মেলা খেলা। মানুষ মননের ডালপালা কে বিকশিত করতে সুখের বাতাবরণেডডুবিয়ে দিতে সাদরে বরণ করেছে বিবিধ উৎসবকে এবং প্রত্যক্ষ সেই উৎসবে অংশগ্রহণ করে মেতে উঠেছে। ,উৎসব হল মানবজীবনের একটি অপরিহার্য অঙ্গ। মানুষ শুধু খেয়ে-পরে বেঁচেই সন্তুষ্ট থাকে না। সে অনেকের সঙ্গে নিজেকে মিলিয়ে দিতে চায়। মানুষ দৈনন্দিন জীবনের গতানুগতিক একঘেয়েমির জীবন থেকে মুক্তি চায় । শ্রমক্লান্ত জীবনে পেতে চায় সহজ অনাবিল আনন্দ । আর তাই মানুষ উৎসবে মেতে ওঠে। উৎসব মানুষকে আনন্দ দেয়, প্রসারিত করে তার অস্তিত্বকে। বাঙালির ভাগ্যাকাশে দুর্যোগের মেঘ বারবার ঘনিয়েছে। কখনও দুর্ভিক্ষ, মহামারী মেতেছে বীভৎস মারণ যজ্ঞে। কখনও রাষ্ট্রীয় বিপর্যয় তাদের ভাসিয়ে নিয়ে গেছে স্থান থেকে স্থানান্তরে । তবুও আনন্দস্রোতে ভাটা পড়েনি, কারণ বাঙালি উৎসব প্রিয় জাতি। আমার আনন্দে সবার আনন্দ হউক, আমার সুখে সবাই সুখী হউক, এই কল্যাণী ইচ্ছাই উৎসবের প্রাণ। সে দিক থেকে বিচার করলে অন্যান্যদের সঙ্গে উৎসবকে নিয়ে বাঙালিরা একটু বেশি আবেগপ্রবণ। বাঙ্গালীদের জীবনে উৎসব যেন একটা অন্য বার্তা বয়ে নিয়ে আসে। তার প্রবাহ, রেস, ধারা ,ঐতিহ্য ,সংস্কৃতি ,পরম্পরা এখনো সমানভাবে বহমান ও প্রচলিত। এক্ষেত্রে বাঙ্গালীদের জুড়ি মেলা ভার।
উৎসব হলো আনন্দময় অনুষ্ঠান।আর আমরা বাঙালিরা উৎসব প্রিয়।উৎসবের মধ্যেই রয়েছে বাঙালির আনন্দ। তাই বাঙালির ভাগ্যাকাশে দুর্যোগের মেঘ বার বার ঘনিয়ে এলেও বাঙালির আনন্দস্রোতে ভাটা কখনো পড়েনি। বাঙালি নানান রঙে বার বার সাজিয়েছে তার উৎসবের ডালি।উৎসবের দিনের আনন্দের মুহূর্ত গুলোকে বাঙালি ছড়িয়ে রেখেছে তার বিস্তৃত জীবনের আঙিনায়। বাঙালি জাতি হিসেবে এখনো তার সংস্কৃত ঘরানায় অনন্য। তার কারণ বাঙালি প্রথম থেকেই একটু বেশি আবেগপ্রবণ এবং অনুভূতির ফল্গুধারায় ভেসে ভেসে চেতনার স্নিগ্ধতায় খুঁজে পায় বেঁচে থাকার অনাবিল অফুরন্ত আনন্দ। বাঙালি সাহিত্য পাগল, সঙ্গীত অনুরাগী, আড্ডাবাজ, প্রাণখোলা, অতিথি পরায়ণ, এবং সর্বোপরি কৃষ্টি, মূল্যবোধ ,সংস্কৃতি, মার্জিত পরিশীলিত উপলব্ধিতে নিজেদের বাস্তব আঙিনায় মেলে ধরে। বাঙালি বরাবরই বাস্তবিকতার খুব একটা ধার ধারে না। আপন ইচ্ছায় খেয়ালখুশিতে, ভাবনার ঘুড়ি উড়িয়ে নীল আকাশের খুঁজে বেড়াই নিজের ঠিকানা। ভাবালুপতায় নিজেকে সর্বদা উজাড় করে হেসেখেলে আনন্দে উৎসবের আবহে মশগুল থাকে। এ যেন বাঙালির ব্যক্তিস্বাতন্ত্র্য অনিন্দ্য সুন্দর বৈশিষ্ট্যাবলী।
"বাঙালি ঘরকুনে" এ অপবাদ আমাদের সকলেরই জানা কিন্তু তাই বলে বাঙালি কখনই আত্মকেন্দ্রিক নয়। আত্মকেন্দ্রিক মানে আপনাতে আপনি বদ্ধ।কিন্তু বাঙালি যদি আপনাতে আপনি বদ্ধ হতো তাহলে বাঙালির বারো মাসে তেরো পার্বণ হতনা। আমার আনন্দে সকলের আনন্দ হোক,আমার আনন্দ আরো পাঁচ জন উপভোগ করুক - এই কল্যাণী ইচ্ছাই হলো উৎসবের প্রাণ।সকল বাঙালির মনে এই ইচ্ছে আছে বলেই
সবাই মিলেমিশে উৎসবে মেতে উৎসবকে সুনির্দষ্টভাবে ভাবে বিভাজন করা যায়না।তাই সকল উৎসবে বাঙালি সবাই মিলে একই ভাবে আনন্দে মেতে ওঠে। ব্যক্তিগত দুঃখ কষ্ট ভুলে সবার সাথে আনন্দে মেতে ওঠায় উৎসবের প্রধান উদ্দেশ্য।উৎসবানুষ্ঠান নিবার্ধ মেলামেশার সুযোগ করে দেয় আমাদের। উৎসবের ময়দানে জাতি ধর্ম অর্থ গত ভেদাভেদের কোনো কোনো প্রাচীর থাকে না। পারস্পরিক আনন্দ প্রীতি বিনিময়ের মধ্য দিয়েই রচিত হয় সুন্দর সুন্দর বন্ধুত্ব। জাতি ধর্ম নির্বিশেষে সকলের এই আনন্দে মেতে ওঠা বাঙালির উৎসব পালনকে করে তোলে সার্থক। পরিশেষে বাস্তবতার মুখোমুখি হয়ে ভুবন মাঝে টিকে থাকতে গেলে উৎসবের প্রাসঙ্গিকতা ও তাৎপর্য কে কখনোই অবদমিত করা যাবে না। সারা জীবন কর্ম ব্যস্ততার মাঝেই জীবনের সহজাত চিন্তাভাবনার আকাঙ্ক্ষা অনুভূতিকে উজ্জীবিত করতে খুঁজে নিতে হবে একটু সুখের আবহ যেখানে আমরা সবাই জাতি-ধর্ম-বর্ণ নির্বিশেষে মিলেমিশে একাকার। তার একমাত্র ক্ষেত্র ভূমি তথা বৃহৎ প্লাটফর্ম হচ্ছে উৎসব যার গুরুত্ব ও তাৎপর্য আগামীতে আরও উত্তরোত্তর বেড়ে যাবে। বর্তমান ডিজিটাল প্রযুক্তির যুগে আমরা সবাই পারিবারিক সম্পর্ক মেলামেশা আত্মীয়-স্বজন পাড়া-প্রতিবেশী বন্ধু-বান্ধবদের ভুলে গিয়ে এক প্রকার অণু পরিবারে বিভক্ত হয়ে বদ্ধ খাঁচায় আটকে গেছে। এখানে নেই কোন পরিপুষ্ট জীবনের সতেজতা, নির্মলতা ও বিকশিত হওয়ার রসদ। প্রতিনিয়ত আমাদের জীবনের মানবিক মূল্যবোধ ও মননশীল অনুভূতিগুলো অনুকূল পরিবেশের সাহায্যের ঘাটতিতে শুকিয়ে যাচ্ছে। আমরা যেন মনুষ্যহীন যান্ত্রিক মানুষের পরিণত হচ্ছি। সর্বশেষ শতাব্দী ভয়ঙ্করতম প্রাণনাশক অতিমারির দুর্বার সংক্রমণের শৃঙ্খলে তাসের ঘরের মতো খন্ড বিখন্ড শ্রেষ্ঠ জীবের রকমারি অনুকুলের সাজানো-গোছানো ঝাঁ-চকচকে সভ্যতার গগনচুম্বী ইমারত। অদৃশ্য ভাইরাসের দাপটে আজ সমগ্র বিশ্বের মানুষ বিধ্বস্ত ,বিপর্যস্ত, শঙ্কিত, দিশেহারা। প্রতিনিয়ত পথ ভ্রষ্ট পথিকের ন্যায় যাযাবরের মতো জীবন। এই প্রতিকূল সঙ্কটের পরিস্থিতি থেকে মানবতার পরিত্রাণের একমাত্র দাওয়াই গণপ্রতিরোধ। সেক্ষেত্রে আমাদের স্বাস্থ্যবিধি, বিধি নিষেধ, প্রশাসনিক অনুশাসন মেনে চলতে হবে। পারিপার্শ্বিক সাবধানতা, সচেতনতা, সংযম আত্মনির্ভরতা কে অগ্রাধিকার দিতে হবে। এছাড়া এই মুহূর্তে এই প্রতিবারই হাত থেকে মুক্তি পাওয়ার কোন উপায় নেই যতক্ষণ না প্রতিষেধকের দেখা মিলছে। ইতিহাস সাক্ষী দেয় মহামারী একদিন কেটে যাবে। তবুও আমাদের সমস্ত প্রতিকূলতা, প্রতিবন্ধকতা, রোগ ব্যাধি, বিপদ বিপর্যয়ের থেকে মুক্তি পেতে গেলে অবশ্যই আমাদের মানবতার মহান ঐক্যে আবদ্ধ হয়ে একসঙ্গে সবাইকে লড়াইয়ের অঙ্গীকার করতে হবে। সেখানেই সমগ্র মানবতার জয় অস্তিত্ব টিকিয়ে রাখার সংকল্প। আবারো ফিরে আসছি সেই বাঙালির চিরাচরিত উৎসবের কথায়। জানি একদিন সমস্ত ঝড় থেমে যাবে, অস্থিরতার মেঘ সরে গিয়ে নীল আকাশে উঠবে নতুন সূর্য এবং দেখা মিলবে আকাঙ্ক্ষিত সেই নতুন সকাল। যেখানে সবাই মনোবলের সঞ্চালনের বেঁচে থাকার নিরবধি রসদে খুঁজে পাবে বেঁচে থাকার স্বাভাবিক পরিবেশ। আবারো পূর্বের ন্যায় মানুষ মিলি ধরবি জীবনের ডালখোলা গুলোকে সাবির বাহারি পসরাতে। পৃথিবীতে যতদিন মানুষ থাকবে ততদিন উৎসবের সর্বজনীন গ্রহণযোগ্যতা, সবিশেষ গুরুত্ব মননশীল ভূমিকা থাকবে অক্ষত ,অমলিন ও চিরসবুজ। বাঙ্গালীদের কাছে উৎসব বেঁচে থাকার চিরায়ত আয়ুধ ও রসদ। তারা সযত্নে, প্রতিপালনে এই উৎসবের আবহে নিজেদের সুখের, আনন্দের ডালাটা কে ছড়িয়ে দিয়ে জীবনের ভালোলাগার পরম অনুভূতিগুলোকে সানন্দে উপভোগ করে। এখানেই উৎসবের নান্দনিকতা, সর্বজনীনতা, গ্রহণযোগ্যতা বেঁচে থাকার জিয়ন কাঠি।
::::::::::::::::::::::::::::::::::::::::::::::::::::::::::::::::::::
পাভেল আমান -- শিক্ষক ও প্রাবন্ধিক -মুর্শিদাবাদ-মো:৯৪৩৪৬৪০০৬০
মন্তব্যসমূহ
একটি মন্তব্য পোস্ট করুন