আমরা একটা অসুস্থ সমাজের মধ্যে বাস করছি
এই সমাজটা আস্তে আস্তে কোথায় যাচ্ছে ভাবলে গা শিউরে ওঠে।চারপাশে প্রতিনিয়ত যা ঘটছে তা যে সামগ্রিকভাবে আমাদের অবক্ষয়ের চিত্রটাই ক্রমাগত তুলে ধরছে এ ব্যাপারে কোনও সন্দেহ নেই।এই সভ্যতার বাইরেটা খুব চিকন-চাকন ভেতরে সেই খড়ের বোঝা।মোড়ক সভ্যতা বললেই বোধ হয় ঠিক বলা হয়।অর্থাৎ মোড়কটি দারুণ কিন্তু ভেতরের জিনিষটি মোটেই ভালো না।বিজ্ঞাপনে মুখ ঢেকে যায়।আর আমরা ক্রমাগত এই মোড়কের প্রতিই আকৃষ্ট হচ্ছি।আমার কাছে অবক্ষয়ের ছবিটাই ক্রমশ স্পষ্ট হচ্ছে।বলতে বাধ্য হচ্ছি-'আগে কী সুন্দর দিন কাটাইতাম।'হয়ত এসব শুনে অনেকেই ভাবছেন শুধু নেতিবাচক কথাবার্তা বলছি।হয়ত নিজেরই মুদ্রাদোষে হতেছি আলাদা। অর্থাৎ সবই ঠিকঠাক চলছে, আমাদের মত কিছু মানুষ আবোল তাবোল বকছি। সত্যিই কি তাই?
দুটি ঘটনা থেকে বোঝা যাবে আমরা ঠিক কোথায় দাঁড়িয়ে আছি। যাদের স্মৃতি মলিন হয়ে যায়নি তারা মনে করতে পারবেন বছর কয়েক আগে আসামে রাস্তার মাঝে কয়েকজন মিলে এক তরুণীর শ্লীলতাহানি করছে,কেউ প্রতিবাদ তো করেইনি উপরন্তু এক সাংবাদিক তরুণীকে বাঁচানোর চেষ্টা না করে শ্লীলতাহানির ছবি তুলতে থাকেন। আর এই তো সেদিনের ঘটনা- রাস্তার ধারে বাড়িতে থেকে পালিয়ে এস এক গৃহবধূ একটি গাছের নিচে বসেছিল,এক মত্ত ট্রাকড্রাইভার তাকে নানাভাবে উত্যক্ত করতে করতে রাস্তার ধারে নিয়ে গিয়ে ধর্ষণ করে।প্রকাশ্য দিবালোকে এই ঘটনা।রাস্তায় তখন বেশ কয়েকজন মানুষ ছিল,তারা দাঁড়িয়ে দাঁড়িয়ে তা দেখেছে,কেউই সাহায্যের হাত বাড়িয়ে দেয়নি।এদের মধ্যে কেউ কেউ পুলিশে ফোন করেছিল,পুলিশ আসার আগেই দুষ্কর্ম শেষ এবং দুষ্কৃতির চম্পট। আর রাস্তার ধারে অটোয় বসে অটোচালক সেই ঘটনার ভিডিও রেকর্ডিং করেছিল। তাকে জিজ্ঞাসাবাদ করা হলে সে বলেছে- পুলিশের হাতে তথ্য তুলে দেওয়ার জন্যই নাকি সে ভিডিও করেছে।প্রশ্নটা আপনাদের কাছেই রাখলাম-কোনটা বেশি জরুরি ছিল দুষ্কৃতির হাত থেকে মহিলাকে রক্ষা করা না ওইসব করা? আর অটোচালক যে সাফাই দিয়েছে তা কতটা গ্রহণযোগ্য?আসলে দাঁড়িয়ে দাঁড়িয়ে উপস্থিত সকলেই ঘটনাটা উপভোগ করেছে বলা যায়।এছাড়া আর কিই বা বলতে পারি? রাস্তার পাশে, বাড়ির পাশে আক্রান্ত মানুষ ,মৃত্যু যন্ত্রণাকাতর মানুষের পাশে আমরা দাঁড়ায় না এখন।যথাসময়ে সাহায্যের হাত বাড়িয়ে দিলে আক্রান্তকে এবং মৃত্যুপথযাত্রী মানুষকে হয়ত অনেক সময় বাঁচানো যায়। কিন্তু আমরা সে পথে হাঁটি না। যেটুকু ভরসা এখন সেই পাড়ার ক্লাব সদস্যদের ওপর,যদিও তাদের সক্রিয় ভূমিকা আজ অনেকটাই কমে গেছে। ঘরের খেয়ে বনের মোষ তাড়াতে আজ আর কেউ ততটা আগ্রহী নয়। আবার তাদের কেউ কেউ রুজি- রোজগারের সন্ধানে ব্যস্ত।কাজেই মানুষ মানুষের জন্য-এই কথাটার ওপর আমরা আর ততটা ভরসা করতে পারি না। তাহলে ভরসা করবো কার ওপর?ছেলেমেয়েরা বয়স্ক বাবা-মাকে তাড়িয়ে দিয়ে বাড়ির দখল নিয়ে নিচ্ছে এ ব্যপারে পাড়প্রতিবেশি যেমন চুপচাপ প্রশাসন ও রাজনৈতিক দলের কর্মীরাও নীরব।বাবা-মা রাস্তায় রাস্তায় ঘুরে মরছেন, কোথাও কোনও সাহায্যের আশ্বাস এবং প্রতিকার না পেয়ে শেষ পর্যন্ত থানা-পুলিশ,কোর্ট-কাছাড়ি এইসব দীর্ঘ প্রক্রিয়ার মধ্য দিয়ে হয়ত তারা নিজদের বাড়িতে ফিরতে পারছেন আবার কোথাও পারছেন না। এই অনাচার ক্রমবর্ধমান।এছাড়াও পুত্র-কন্যা মিলে সম্পত্তির লোভে যে কোন একজন বেঁচে থাকা বয়স্ক বাবা বা মাকে খুন করে সম্পত্তির দখল নিচ্ছে। এ শুধু সংবাদপত্রের খবর নয়,চারিদিকে নিজের চর্মচক্ষেই দেখতে পাচ্ছি। কী আশায় বাঁধি খেলাঘর বেদনার বালুচরে। বেঁচে থাকতে থাকতেই মৃত্যুর অধিক যন্ত্রণা ভোগ করছেন বয়স্ক নাগরিকরা।একটা নির্বোধ সমাজের মধ্যে বাস করছি আমরা। আর নেতারা বলছেন সমাজ, দেশ এগিয়ে চলছে।তাই প্রশ্ন জাগে তাহলে কি পিছন দিকে এগিয়ে চলছে?গর্ভবতী মহিলা কন্যা সন্তান ধারণ করেছে জানতে পেরে স্বামী ও শ্বশুর বাড়ির অন্যান্যরা মিলে গৃহবধুকে খুন।অথচ এটিই ওই মহিলার প্রথম গর্ভধারণ।এখানেই প্রশ্ন জাগে আজও আমাদের সমাজে নারীরা কতটা সুরক্ষিত?সংবাদপত্রের পাতা খুললেই প্রায় প্রতিদিন নজরে পড়ে এ ধরণের খবর ধর্ষণ করে খুন,মুখে অ্যাসিড ছুঁড়ে দেওয়া,বিয়ের পর বাপের বাড়ি থেকে আরও পয়সা নিয়ে আসার জন্য নানা নির্যাতন, বাড়ি থেকে বের করে দেওয়া,ছলে বলে গৃহবধূকে হত্যা করা আরও কত কি। এইসব কি কোনও সভ্যসমাজে ঘটা উচিত?বাবাকে খুন করে থানায় আত্মসমর্পণ ছেলের, বন্ধু বন্ধুকে খুন,তরুণীকে তুলে এনে কয়েকজন মিলে ধর্ষণ, প্রেমিকাকে কয়েকজন মিলে ধর্ষণ এবং খুন,চার বছরের ছেলেকে খুন করে আত্মঘাতী মা-এইসব খবরেই এখন সংবাদপত্রের পাতা ভরে যায়।অনেকে বলছেন আগেও এরকম ঘটত কিন্ত জানতে পারতাম না। এখন সংবাদমাধ্যমের অতিসক্রিয়তার ফলে আমরা জানতে পারছি বলে এত হৈ চৈ। কথাটার মধ্যে আংশিক সত্যতা থাকলেও পুরোটা ঠিক নয়।এসব বলে অনেকেই বাস্তব পরিস্থিতিকে হাল্কা করে দিতে চাইছেন। আসল সত্যিটা হল-এখন ঘটনার ঘনঘটা যেমন বেড়েছে তেমনি মানুষের মধ্যে নিষ্ঠুরতাও বেড়েছে।আর মূল্যবোধের অবক্ষয় তলানিতে এসে ঠেকেছে।সংবাদমাধ্যমের কথা যখন উঠলোই তখন একটা কহা এখানে বলি- বৈদুতিন মাধ্যমের বাড়াবাড়ি আর সহ্য হচ্ছে না। কিছু চ্যানালের অসভ্যতায় অনেকেরই মাথা গরম হয়ে যায়।
শোকাবহ ঘটনাকে কীভাবে পণ্য করা যায়,ধর্ষণের ঘটনাকে কীভাবে উপস্থাপিত করলে,মৃত্যুর ঘটনাকে কীভাবে উপস্থাপিত করলে পাবলিক খাবে-এইসব ভেবে, শোকগ্রস্ত পিতা-মাতা এবং আত্মিয়-স্বজন্দের প্রশ্নবাণে জর্জরিত তা সরাসরি দর্শকদের দেখানো এটাই দস্তুর এখন। শোকগ্রস্ত মানুষের মুখ দিয়ে কথা সরছে না তবু নাছোড় চ্যানালের সাংবাদিকরা ।দুর্ঘটনাগ্রস্ত এলাকায় যেখানে সাধারণ মানুষ এবং সংশ্লিষ্ট দপ্তরের আধিকারিকেরা উদ্ধার কাজে ব্যস্ত সেখানেও চ্যনালের সাংবাদিকেরা তাদের নানা প্রশ্নে বিরক্ত করে উদ্ধার কাজে বিঘ্ন ঘটায়। মানুষ কথা বলার অবস্থায় না থাকলেও তাদের প্রশ্নবাণ চলতেই থাকে।এই অসভ্যতা চলতে দেওয়া উচিত নয়।মানুষের মধ্যে নিত্য নতুন নিষ্ঠুরতা দেখতে দেখতে সুস্থ সবল মানুষেরাও দিনে দিনে প্রতিরোধহীন হয়ে পড়ছে,কোথাও তিলমাত্র প্রতিবাদ নেই বলেই এই অবস্থা। প্রতিবাদ করার মানুষরা আজ ভীত সন্ত্রস্ত।আমরা এখন একটা অসুস্থ সমসজের মধ্যে বাস করছি বললে বোধ হয় খুব একটা মিথ্যা বলা হয় না।
=================================
ASHIS CHOWDHURY, B-4/3,ROAD NO.-5, RIVERSIDE TOWNSHIP,
P.O-BURNPUR . DIST- WEST BARDHAMAN.PIN-713325. MOBILE NO. 9474378170.